Home মতামত করোনার কবলে জাতীয় শিক্ষা

করোনার কবলে জাতীয় শিক্ষা

by domaist
19 views

চলমান করোনা ভাইরাসের প্রভাব পুরো বিশ্বকেই বিপর্যস্ত করে তুলেছে। অর্থনীতিতে নেমে এসেছে বড় ধরনের ধস। আন্তঃরাষ্ট্রীয় যোগাযোগ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে সৃষ্টি হয়েছে বড় ধরনের অচলাবস্থা। বিশ্বের ১৮৮ দেশে এই মরণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা কোটির কাছাকাছি পৌঁছেছে। মৃতের সংখ্যাও প্রায় ৫ লাখ। আমাদের দেশকেও তা অক্টোপাসের মত চেপে ধরেছে। বেশ আগেই আক্রান্তের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যাও ইতোমধ্যেই দেড় হাজার অতিক্রম করেছে। সঙ্গত কারণেই আমাদের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যে বেহাল দশার সৃষ্টি হয়েছে।

করোনার প্রভাবে আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পও চলছে বেশ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। বৈশ্বিক মন্দার কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহও একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে নেমে এসেছে। বৈদেশিক শ্রমবাজারও বড় ধরনের হুমকীতে পড়েছে। এমনকি শিক্ষাক্ষেত্রেও সৃষ্টি হয়েছে বড় ধরনের বিপর্যয়। করোনার উচ্চ সংক্রমণ ঠেকানোর জন্যই দেশের সকল পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিক পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। যা জাতীয় জীবনে সবেচেয়ে বড় বিপর্যয় বলেই মনে করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে এতবড় বিপর্যয় আর কখনো আসেনি।

করোনার প্রভাবে সকল স্তরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকার গত মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা এবং পর্যায়ক্রমে তা আগামী ৬ আগাস্ট পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। অবশ্য শিক্ষা ক্ষেত্রে স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার জন্য সংসদ টিভির মাধ্যমে পাঠদান কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। প্রথম দিকে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাদান কর্মসূচি শুরু করা হলেও পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক শিক্ষাদান কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।

দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ পরিসরে বন্ধ থাকার কারণে জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে। কারণ, সংসদ টিভি শুধু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে। আর অন্যান্য পর্যায়ে এই ক্ষতি সীমিত পরিসরে রাখার জন্যই কিছু উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে। ইতোমধ্যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইনে পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ, মূল্যায়ন ও নতুন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে একটি গাইডলাইন বাংলাদেশ মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশ করেছে। আর কীভাবে অনলাইনে সর্বজনীন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা যায়, সেদিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এর প্রয়োগটা এখনও গৌণ পর্যায়েই রয়ে গেছে।

অবশ্য এক্ষেত্রে আমাদের দেশে নানাবিধ সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতাও রয়ে গেছে। কারণ, অনলাইন বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনার জন্য আমাদের পরিবেশ-পরিস্থিতি, আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও যথাযথ প্রশিক্ষণের অপ্রতুলতা বিষয়টি বেশ প্রকট। ফলে অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের কোনভাবেই স্থলাভিষিক্ত হতে পারছে না। কিছুটা দায়সারা গোছেরই মনে হচ্ছে। মূলত ডিজিটাল দক্ষতা বলতে বোঝায় যান্ত্রিক উপায়ে তথ্য ও যোগাযোগের প্রযুক্তিগত উপায়গুলো ব্যবহার করতে পারা। ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন সাধারণ বুদ্ধি, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান।

কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা রীতিমত চোখে পড়ার মত। তথ্য-প্রযুক্তির জয়জয়কারের এই সময়ে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করলেও শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এখনও প্রয়োজনের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেনি। এমতাবস্থায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত জ্ঞান, পূর্ব অভিজ্ঞতার অভাব এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ সহজলভ্য না হওয়ায় আমাদের দেশের শিক্ষাকার্যক্রম পুরোপুরি যুৎসই করে তোলা সম্ভব হয়নি।

শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির থাকা অর্থই হলো শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সেশন জট তৈরি হওয়া। আশার কথা, স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য সংসদ টিভির মাধ্যমে ক্লাস চালু করা হয়েছে। কলেজ পর্যায়েও চালু হয়েছে অনলাইন ক্লাস। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এ ব্যাপারে বেশ তৎপর। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাবে স্টুডিও স্থাপন করে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তা কোনক্রমেই যথেষ্ট মনে করতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

সঙ্গত কারণেই এই বিষয়ে নানাবিধ পরামর্শ এসেছে বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে। কারণ, আমাদের দেশে প্রযুক্তি লভ্যতার ক্ষেত্র স্থান-কাল-পাত্রভেদে এক এবং অভিন্ন করা এখনো সম্ভব হয়নি। সকল শ্রেণির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এক পাল্লায় মাপারও সুযোগ নেই। তাই প্রত্যন্ত অঞ্চল তথা সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করেই একটি সর্বজনীন অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম নীতিমালা প্রণয়নের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকেই। শহর বা নগরের সাথে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চল বা দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের আধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধার অনেক পার্থক্য রয়ে গেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনলাইন শিক্ষায় সরাসরি কথোপকথন সমস্যা, কথোপকথনের ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যক্তির অংশগ্রহণ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের অপ্রতুলতা, ই-লার্নিং এ অনভ্যস্ততা, দুর্বল ইন্টারনেট ব্যবস্থা, ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যয়বহুলতাসহ নানা ধরনের সমস্যা বিদ্যমান। তাই অনলাইনভিত্তিক শিক্ষাকার্যক্রম সফল ও ফলপ্রসূ করে তুলতে এসব সমস্যার আশু সমাধান করতে হবে।

অবশ্য অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের মোটেই সমান্তরাল মনে করা ঠিক হবে না বরং সহায়ক মনে করাই যুক্তিযুক্ত। একজন শিক্ষক যখন সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন তখন তিনি সহজেই শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রভাব বিস্তার এবং শ্রেণিকক্ষ নিয়ন্ত্রণও করতে পারেন। কিন্তু অনলাইন পদ্ধতির ক্লাসে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র স্থাপনের অভাবে শ্রেণিকক্ষের কার্যকারিতা সফল হয়ে ওঠে না। অনেক সফটওয়ারে অধিকসংখ্যক ছাত্রছাত্রীদের সরাসরি সম্পৃক্ত করে শ্রেণিকার্যক্রম চালানো খুবই কঠিন। আমাদের দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হলেও সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বরং লোডশেডিং আমাদের দেশে এখনও বড় একটি সমস্যা। আর অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় ধরনের দুর্বলতা।

আমাদের দেশে অনেক শিক্ষার্থী ই-লার্নিংয়ে তেমন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না বা পূর্ব থেকে অভ্যস্তও নয় বরং তারা ট্রেডিশনাল পদ্ধতিতেই অভ্যস্ত। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার অনেক শিক্ষার্থীও সেই পুরোনো বৃত্তেই রয়ে গেছে। অনেক শিক্ষকও এখনো এ পদ্ধতির সঙ্গে নিজেদেরকে উপযোগী করে নিতে পারেননি। আর অনলাইন শিক্ষা আমাদের দেশের মত উন্নয়নশীল দেশে অনেকটা ব্যয়বহুলও। এই পদ্ধতির শিক্ষার জন্য প্রয়োজন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও ইন্টারনেটের মত প্রযুক্তিগত আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা। দেশের নি¤œবিত্ত ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর কাছে তা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এ ছাড়া এ প্রযুক্তির সুবিধা নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রবাহের পাশাপাশি ইন্টারনেটে সংযুক্ত থাকার জন্য ডাটা কিনতে হয়। পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশের ইন্টারনেট বেশ ব্যয়বহুল। গ্রামীণ পর্যায়ে এখনো ব্রডব্যান্ড লাইনের সুযোগ পৌঁছেনি। স্মার্টফোন ক্রয় দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য এখনো নাগালের বাইরে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুর্বল নেটওয়ার্ক ইন্টারনেট ব্যবহারকে গতি দিতে পারে না। তাই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের এ সমস্যাগুলো সমাধান না করেই প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছে তার সুযোগ সুবিধা সমভাবে পৌঁছে দেয়া সম্ভব নয়।

একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, করোনাকেন্দ্রিক বিপর্যয়ের সময়ে আমাদের দেশে শিক্ষাকার্যক্রম চালু রাখার বিকল্প তথা প্রযুক্তিনির্ভর করার প্রচেষ্টা চলছে। দৈনিক পত্রিকা, টেলিভিশনে আগে থেকেই অনেকটা ব্যবসায়িক কারণে এই কাজ চালু করেছে। সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে তার পরিধি আরও বেড়েছে। সেনাবাহিনী পরিচালিত অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইনে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে। বিভাগীয় শহরগুলোতেও বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিতভাবে অনলাইন শিক্ষা দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে নেতিবাচক দিক হচ্ছে, কোন ক্ষেত্রেই এসব কার্যক্রম পুরোপুরি সফল হতে পারছে না। কারণ, এক্ষেত্রে আমাদের প্রতিবন্ধকতা ও দুর্বলতাগুলো এখন পর্যন্ত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। আর অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমে নানাবিধ সমস্যাও উপেক্ষা করার মত নয়। কারণ, আমাদের দেশের শিক্ষা একমুখী ও অভিন্ন নয়। দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা একমুখী হলে একটি কেন্দ্র থেকে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে তাদের প্রয়োজনীয় অনেক বিষয় অনুশীলন করতে পারত। কিন্তু আমাদের দেশে বহুমুখী শিক্ষা এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায়। আর এ সমস্যার আশু সমাধানও সম্ভব নয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শুধু শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রমই ব্যহত হচ্ছে না বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রেই নানাবিধ জটিলতায় সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত লাখ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছেন। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়ের প্রধান উৎস টিউশন ফি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। আর এ সমস্যা সমাধানের জন্য ইতিমধ্যে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সংগঠন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারের কাছে ৩৯০ কোটি টাকা প্রণোদনা দাবি করেছে।

এছাড়া কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত ৪০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী বেতন না পাওয়ার কারণে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। তারাও সরকারের কাছে এসব প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ৫০ কোটি টাকা প্রণোদনা দাবি করেছেন। অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১০ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীও তাদের দৈন্যদশা তুলে ধরে প্রণোদনা দাবি করেছেন। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে এসব প্রতিষ্ঠানের বাড়িভাড়া, আনুষঙ্গিক ব্যয়ভার বহন করা দুর্বিষহ হয়ে পড়বে। ফলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাকে পুরোপুরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় আনার কথা থাকলেও সরকার অর্থনৈতিক কারণে তা করতে পারছেন না। কিন্তু বেসরকারি পর্যায়ে যারা সরকারের এই ব্যবস্থায় সহযোগিতা করছেন, তাদেরকে অবশ্যই বাঁচিয়ে রাখার বিষয়টিও অস্বীকার করার মত নয়। কারণ, সে প্রক্রিয়ার সাথে শিক্ষার্থীদের বিরাট একটি অংশ জড়িয়ে রয়েছে। আর এই সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ লাখের কম নয়। তাই এতো বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবঞ্চিত রেখে কোন জাতিই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে না। তাই সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয় ও অঞ্চলভিত্তিক বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া দরকার। তথ্যপ্রযুক্তি, দূরশিক্ষণ, অনলাইন পদ্ধতি, রেডিও, টিভি যেখানে যে পদ্ধতি বাস্তবসম্মত, তা বিবেচনা করে অবশ্যই পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় শুধু শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই নয়, অদূর ভবিষ্যতে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞমহল।

এমনিতেই শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অনেকটাই পিছিয়ে। আমাদের জাতীয় শিক্ষা বিশ্বমানের না হওয়ায় প্রতিবছর বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শ ফি বাবদ হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যায়। কিন্তু দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বমানে উন্নীত করা গেলে এই অর্থ দেশেই থেকে যেতে পারতো। এমনকি দেশে বসেই বিদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি ডলার উপার্জন সম্ভব হতো। বিশ্বমানের শিক্ষার জন্য বাজেট পর্যন্ত অর্থ বরাদ্দসহ মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে না পারলে এই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশ শিক্ষাক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। বলা হয়েছে, শিক্ষার ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তিতে গুরুত্ব দিলেও দক্ষতার ব্যবহারে বিশ্বের ১৪৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৫তম। এমনকি শিক্ষার গুণগত মান নিয়েও রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। কারণ, তৃতীয় শ্রেণির ৩৫ ভাগ শিশু ভালোভাবে বাংলাও পড়তে পারে না। যা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।

বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশে শিক্ষায় খরচ কম। এ অবস্থায় শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ না করলে শিক্ষার গুণমান আরো নিম্নমুখী হবে। স্বাভাবিক বিকাশ ও শিক্ষার পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জন্য কঠিন হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা সেশন জটে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর সাম্প্রতিক করোনা প্রভাব সার্বিক পরিস্থিতিকে আরও প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে এই শূন্যতা কাটিয়ে ওঠার জন্য সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত হওয়া দরকার।

এমতাবস্থায় করোনাকালীন ক্ষতি সীমিত পর্যায়ে রাখার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঐচ্ছিক ছুটি কমিয়ে বাকি দিনগুলোতে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিতে ফেরানোর আবশ্যকতাও দেখা দিয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ের ক্লাসের সময় বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে অভিজ্ঞমহল থেকে। তবে নিরাশার কথা হলো করোনার পরিস্থিতির তেমন কোন উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বরং ক্রমেই সার্বিক পরিস্থিতির অবনতিই হচ্ছে। তাই সবার আগে করোনা পরিস্থিতিকে সহনীয় পর্যায়ে আনার প্রতি জোর দেয়া উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর অনলাইন ও দূরশিক্ষণের মাধ্যমে সেই ক্ষতি সীমিত পরিসরে রাখার চেষ্টা করাও জরুরি।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা গেছে অনেক মহামারিই বিপর্যস্ত করেছে পৃথিবীকে। কিন্তু সভ্যতার অগ্রযাত্রা কখনোই থেমে থাকেনি। সাম্প্রতিক সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আমাদের পক্ষেও পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই বরং সেই বৃত্ত থেকে আমাদেরকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। করোনার বিস্তৃতি রোধের জন্য দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। শিক্ষানুরাগীরা চাচ্ছেন, শিক্ষার প্রবাহ চালু থাকুক। কিন্তু এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উম্মুক্ত করে দেয়াও হবে আত্মঘাতী। তাই আমাদেরকে এজন্য বিকল্প পথেই অগ্রসর হতে হবে। আর সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই শিক্ষাকার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য সংসদ টিভি ও অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধাগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টাও করা হচ্ছে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তা জরুরি ভিত্তিতে সমাধান করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায় আমাদের কোন আয়োজনই সফল ও সার্থক হবে না।

লেখক: ইবনে নূরুল হুদা

You may also like

Leave a Comment