Home মতামত মাকে ফেলে দিয়ে কী দোষ করেছে সন্তান?

মাকে ফেলে দিয়ে কী দোষ করেছে সন্তান?

by domaist
183 views

নানা কারণে সমাজে আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থাকি। এ কারণগুলো অনেক রকম হতে পারে। তবে ঝুঁকি নেয়ার প্রধানতম কারণ, অর্থ। কখনো, কৃষি, স্বার্থ আবার কখনো আত্মমর্যাদা। কখনো স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব। কোনো সময় নারীঘটিত স্বার্থ জড়িত থাকে। এসব বিষয়ে মানুষকে জীবনের ঝুঁঁকি নিতে দেখা যায়। সে কারণে আমরা প্রায় সময় দেখতে পাই, দুই গ্রামের ‘মর্যাদার লড়াই’র নামে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। যারা এ সংঘর্ষ যোগ দেন তারা জীবনের ঝুঁঁকি নিয়েই যোগ দেন। তারা চিন্তা করতে চান না যে, এর পরিণতিতে মৃত্যুও হতে পারে। প্রধানত যে কারণে জীবনের ঝুঁকি মানুষ নেয় সেটি হলো অর্থ। আমরা দেখি, অর্থের জন্য, সম্পদের জন্য ভাইয়ে ভাইয়ে সঙ্ঘাত হচ্ছে, এক ভাই আরেক ভাইকে খুন করছে কিংবা ভাইয়েরা মিলে বাবাকে খুন করছে অথবা সন্তান তার পিতা-মাতাকে হত্যা করছে। এসব অপরাধের পেছনে সাধারণত থাকে অর্থনৈতিক স্বার্থ। এ ক্ষেত্রে জেল খাটার এমনকি মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি থাকে। এতসব ঝুঁঁকির পরও মানুষ নিজেকে প্রাণঘাতী অপরাধে জড়িয়ে ফেলে।

এখন কথা হলো, এই পরিস্থিতি কেন তৈরি হয়? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্বার্থের সঙ্ঘাতের কারণে তা তৈরি হচ্ছে। এর সাথে মর্যাদার সঙ্ঘাতও আছে। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের কথা যদি চিন্তা করি, তাহলে দেখব, সেখানে কোনো ব্যক্তির লাভের প্রশ্ন ছিল না। সেখানে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত ছিল না। সেখানে শুধু স্বাধীনতা অর্জনের প্রশ্ন ছিল। সামগ্রিকভাবে একটি জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদা ও অত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রশ্ন ছিল। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ করে তরুণরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাদের যথাযথ অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ ছিল না। কিন্তু দেশের ভূলুণ্ঠিত মর্যাদা রক্ষায় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। সে যুদ্ধে কে জীবিত থাকব বা কে মারা যাবে, তা চিন্তা করিনি।

এখানে দু’টি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। একজন রোগী হলিফ্যামিলি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। তিনি মারা গেলে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনকে জানানো হয় যে, তাদের কাছে একটি বেওয়ারিশ লাশ আছে তা দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। ফাউন্ডেশনের লোকজন হাসপাতালে ওই মৃত মানুষটির কোনো স্বজনের খোঁজ পেল না। এ সময় তাদের মনে প্রশ্ন জাগলো যে, এই দুর্দিনে যে লোক এখানে ভর্তি হতে পারেন, তিনি কোনো সাধারণ লোক নন। নিশ্চয় তিনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তা না হলে এ হাসপাতালে আইসিইউ পাওয়ার কথা নয়। একপর্যায়ে ওই মৃত লোকের আত্মীয়দের খোঁজাখুঁজি শুরু হলো। কেননা স্বজন ছাড়া লাশ দাফন করা হলে আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। পরে জানা গেল, মৃত ব্যক্তি ইব্রাহিম কার্ডিয়াক মেডিক্যাল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মুহিউদ্দিন খান। গত ৩ জুন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর আগে ১৪ দিন আইসিইউতে ছিলেন। তারও ২৪ দিন আগে তার করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে। ঢাকা মেডিক্যাল থেকে আট বছর আগে অবসর গ্রহণ করে তিনি ইব্রাহিম কার্ডিয়াক মেডিক্যাল কলেজে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর পর তার কোনো আত্মীয়ের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকরা তার আত্মীয়দের আর পাওয়া যাবে না মনে করে দাফনের ব্যবস্থা নেন। বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করতে স্বেচ্ছাসেবকরা একটি ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে থানায় জিডি করে নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট নেন এবং পরে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবেই দাফনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু এত কিছুর পরও স্বেচ্ছাসেবকরা তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে মানতে রাজি ছিলেন না। তাই তারা লাশ দাফন স্থগিত রেখে আবার হাসপাতালে যোগাযোগ করেন।

স্বেচ্ছাসেবী দলটির এক সদস্য বলেন, আমরা জানতে পারলাম যে, ইব্রাহিম মেডিক্যাল হাসপাতাল থেকে এসে তিনি হলিফ্যামিলি হাসপাতালে ভর্তি হন। আমরা যখন সে হাসপাতালে ফোন করি তারা সাথে সাথেই ডা: মুহিউদ্দিনকে চিনতে পারেন। তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃতের স্বজনদের নাম্বার দেয়। সে নাম্বারে কল করে স্বেচ্ছাসেবীরা জানতে পারেন, মৃত ডা: মুহিউদ্দিনের ছেলে কানাডায় বসবাস করেন। তার সাথে কথা হলে তিনি জানান, দেশে তাদের কেউ বাস করেন না। তাই তিনি কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনকে তার বাবার লাশ দাফনের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেন। আর তার বাবার নামাজে জানাজা ও দাফনের ভিডিও আর ছবি তুলে যেন তাকে স্বেচ্ছাসেবীরা পাঠিয়ে দেন। তার ছেলের সাথে কথা বলে ফোন রাখার পরেই আরেকটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে। চট্টগ্রাম থেকে কল দিয়ে ওই ডাক্তার বলেন, লাশের গোসল দিয়ে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন যদি পাঠাতে পারে তা হলে তারা মিরসরাইয়ে দাফন করবেন। কিছুক্ষণ পর আবার একই ব্যক্তি কল করে বলেন, তারা সেখানে দাফন করতে পারবেন না। এমন পরিস্থিতিতে দোটানায় পড়ে যান স্বেচ্ছাসেবীরা। পরে ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই চট্টগ্রামের সেই লোক কল করে লাশ ঢাকাতেই দাফনের সিদ্ধান্ত জানান। পরে রায়েরবাজার বধ্যভূমি গোরস্থানে মরহুম মুহিউদ্দিনকে দাফন করা হয়। দাফনের পর তার ভাই যিনি নিজেও সরকারের পদস্থ কর্মকর্তা, ফোনে জানালেন যে, তিনি তার এক কর্মচারীকে পাঠাচ্ছেন দাফনের সাক্ষী হিসেবে। এ দিকে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক মেডিক্যালের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি আমিও শুনেছি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি ভাইরাল হয়েছে। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। একজন সহকর্মীর এমন পরিস্থিতি কেউ কামনা করে না।’

এমনি আরেক বিপদে পড়েছেন দাউদকান্দির সুফিয়া খাতুন। তার বয়স ১০০ বা তার কাছাকাছি। ভিটামাটি কিছু নেই, ছেলে মেয়ে দু’জন। তারাও বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তাদের সংসার চলে নিদারুণ কষ্টে। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের মাকে রাস্তায় ফেলে গেছেন। সুফিয়া খাতুনকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে উপজেলা প্রশাসন। চিকিৎসার পাশাপাশি অন্য বন্দোবস্ত করেছে তারা। এখন তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ। কিন্তু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হওয়ার চার মাস পরও সুফিয়াকে তার পরিবারের সদস্যরা কেউ নিতে আসেনি। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সুফিয়া সেখানে চিকিৎসাধীন। তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। করোনা সংক্রমণকালে বৃদ্ধা সুফিয়া খাতুনের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকাটাও ঝুঁকিপূর্ণ। হাসপাতাল থেকে জানা যায়, তিনি চোখে দেখেন না। কানেও কম শোনেন। তাকে ১৭ ফেব্রুয়ারি ফেলে যাওয়া হয় দাউদকান্দির গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। প্রথমে তিনি কিছুই বুঝে উঠতে পারেননি। দীর্ঘ সময় আপন কাউকে কাছে না পেয়ে চিৎকার শুরু করেন। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে বৃদ্ধা সুফিয়াকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তির ব্যবস্থা করেন।

১৮ ফেব্রুয়ারি উপজেলা প্রশাসন সুফিয়ার ছেলের খোঁজ পায়। তাকে ডেকে এনে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কথা বলা হয়। তখন পারিবারিক অসচ্ছলতার কথা তিনি জানান। দাউদকান্দির নসরুদ্দি গ্রামে সুফিয়ার বাড়ি। স্বামী কালাই মিয়া ২০ বছর আগেই মারা গেছেন। পরিবারটির এক শতক জমির ওপর বসতঘর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। সেটিও এখন আর নেই। একমাত্র ছেলে মুখলেসুর রহমান বয়োবৃদ্ধ। তিনি ভিটার নিজের অংশটি পাঁচ বছর আগে বিক্রি করে দেন তার বোনের কাছে। এর পর থেকে মুখলেসুর রহমান বসবাস করেন মেয়ের বাড়িতে। মুখলেসুর বলেন, অভাবের কারণে ৯ বছর আগে তার স্ত্রী সৌদি আরব চলে গেছেন। তার সাথে আর যোগাযোগ রাখেননি। তিনি বাসে চানাচুর বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এমন পরিস্থিতিতে মাকে নিজের কাছে রাখতে পারেননি। সুফিয়ার একমাত্র মেয়ে মিনারও বয়স হয়েছে। তিনি থাকেন উপজেলার গঙ্গাপ্রসাদ গ্রামে। তিনি পৈতৃক ভিটা বিক্রি করে দিয়েছেন। তার কাছেই এত দিন মা সুফিয়া ছিলেন। দারিদ্র্যের কারণে তিনি তার মাকে মহাসড়কের পাশে ফেলে গিয়েছিলেন।

মিনার বয়স হয়ে যাওয়ায় কোনো কাজ করতে পারেন না। তার স্বামী আবদুল মান্নানও বৃদ্ধ। তাদের এক ছেলের আয়ে কোনো মতে সংসার চলে। ইউএনও জানান, সুফিয়া খাতুনের দায়িত্ব ছেলে মুখলেসুরের নেয়ার কথা থাকলেও সামর্থ্যরে অভাবে কিছু করতে পারছেন না। আবার এ মুহূর্তে সুফিয়াকে কুমিল্লা বা চট্টগ্রামের বৃদ্ধাশ্রমেও নেয়া যাচ্ছে না। ঢাকার আগারগাঁওয়ের বৃদ্ধাশ্রমে তার কথা হয়েছে। তবে এর আগে স্বেচ্ছায় তার দায়িত্ব কেউ নিতে চাইলে দেয়া হবে। সুফিয়া বেগমকে বয়স্ক-ভাতার কার্ড ও হুইল চেয়ার দেয়া হয়েছে। স্বেচ্ছায় কেউ তার দায়িত্ব নিতে চাইলে তাকে এক লাখ টাকার একটি ঘর নির্মাণ করে দেয়াসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে।

আসলে এরকম পরিস্থিতিতে করণীয় কী? যেখানে মৃত্যুভয় এবং যার কোনো প্রতিষেধক নেই, করোনা রোগী তার আত্মীয়স্বজনের জন্য মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারেন। এরকম সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, ছেলে-মেয়েরা বা পাড়ার লোকজন আক্রান্ত রোগীকে বের করে দিয়েছে। এ অবস্থায় নিজের জীবনের স্বার্থে সাধারণত এই অসুস্থদের বা বয়োবৃদ্ধদের জন্য কোনো ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত সমাজে দেখা যাচ্ছে না। আমরা শুধু যদি তার সন্তানদের দায়ী করি, সেটি যথাযথ হবে না। কারণ তাদেরও জীবনমৃত্যুর প্রশ্ন এখানে জড়িত। সে কারণে সরকারকেই এর দায়িত্ব নিতে হবে। সরকারকে অধিকসংখ্যক বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তুলতে হবে। হাসপাতাল থেকে করোনা রোগী বা বয়স্ক রোগীদের ফিরিয়ে দেয়া যাবে না। অর্থাৎ সিনিয়র সিটিজেনদের দায়িত্ব সরকারকেই পালন করতে হবে। এ করোনাকালে বিষয়টি নতুন করে ভেবে দেখার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কেননা সমাজ যে ধারায় চলছিল বা যে মূল্যবোধে চলছিল তা ক্রমেই অবসিত হচ্ছে। তাই নতুন করে ভাবতে হবে এবং এর প্রধান দায়িত্ব সরকারের। যদিও বিত্তবানরা সমাজে নতুন কোনো ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেন।

লেখক: ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

You may also like

Leave a Comment