ভালো-মন্দ আলোচনায় তারেকের নেতৃত্ব নেতাদের ধৈর্য ধরতে বলেছেন খালেদা

0
22

দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে বিএনপিতে এখন ভালো ও মন্দ দুই ধরনের আলোচনা চলছে। কারো মতে, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কিছু ভালো কাজ করেছেন, যা আগে হয়নি। আবার কেউ মনে করছেন, তাঁর নেতৃত্বে কার্যকর ও নতুন কিছু হচ্ছে না। বরং বর্তমানে যেভাবে চলছে তাতে দলটির ভবিষ্যৎ নেই।

একটি সূত্রের দাবি, তারেককে নিয়ে দলের মধ্যে এমন পরিস্থিতির খবর সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছেও গেছে। তবে নেতাদের তিনি ধৈর্য ধরতে বলেছেন। ‘আমি তো এখনো বেঁচে আছি, সবাই এত অস্থির কেন’—নেতাদের উদ্দেশে এমন কথাও সম্প্রতি খালেদা জিয়া বলেছেন বলে নির্ভরযোগ্য ওই সূত্রের দাবি। সম্প্রতি দলটির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদকে শোকজ নোটিশ দেওয়ার পর দলের মধ্যে সৃষ্ট অস্থিরতার কারণে খালেদা জিয়া ওই বার্তা দেন বলে জানা যায়।

একটি দুর্নীতি মামলায় সাজা হওয়ায় খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়া হলে ২০১৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা দেওয়া হয়। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক ওই পদ পান। তবে গত ২৫ মার্চ খালেদা জিয়ার কারামুক্তির পরও তারেক ওই পদে বহাল আছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ এই ঘটনাকে ‘অদ্ভুত এক ব্যবস্থা’ বলে মনে করেন। আবার কারো মতে, খালেদা জিয়া অসুস্থ থাকায় বিএনপির নেতৃত্বের জন্য এটিই অনিবার্য। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে তারেক রহমানের নেতৃত্বের দুই বছর পূর্ণ হবে। এদিকে সরকারের মেয়াদও এরই মধ্যে দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। ফলে আগামী নির্বাচনকে সামনে নিয়ে বর্তমান নেতৃত্ব কী করতে পারবে এমন আলোচনায় উঠে আসছে তারেকের নাম।

বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষী বলে পরিচিত গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, ‘সাত হাজার মাইল দূর থেকে তারেক রহমানের হুকুমনামায় বিএনপি বেশি দূর যেতে পারবে না। কারণ তাঁকে অন্যের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দল চালাতে হয়।’ বুধবার কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘সেনাপতি যুদ্ধের আশপাশে না থাকলে যুদ্ধে জয়লাভ করা যায় না। আমার মনে হয় জোবাইদা বা জাইমা রহমানকে সামনে আনলে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, ‘বিএনপির ভেতরে ও বাইরে যেসব শক্তি দলটিকে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে দেখার প্রত্যাশা করে তারা বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে হতাশ। কারণ বিএনপির মতো বড় একটি দল একটি পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বার্থে বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বকে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি দায়বদ্ধ হতে হবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার অবশ্য মনে করেন, ‘বিএনপির স্থায়ী কমিটিকে দিয়ে তারেক রহমান যেভাবে কাজ করিয়ে নিচ্ছেন তাতে হি ইজ ওয়ান অব দ্য বেস্ট অর্গানাইজার।’ তিনি বলেন, ‘তারেক অনেক ডেভেলপ করেছেন।’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কাজের সঙ্গে এখন ইমেজটা একটু অর্জন করলেই হয়ে যায়।’ ‘স্থায়ী কমিটিকে বাইপাস করে তারেক কিছু করেন না। দু-একটি সিদ্ধান্ত তিনি নিলেও সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়’ এমন দাবি করেন সাবেক এই স্পিকার।

নেতৃত্বের প্রশংসাও কম নয়

আগে বিএনপিতে স্থায়ী কমিটির নিয়মিত বৈঠক না হওয়া নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও তারেক দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই অবস্থার অবসান হয়েছে। তাঁর সভাপতিত্বে এক বছর ধরে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির নিয়মিত বৈঠক হওয়ার ঘটনা দলের ভেতরে-বাইরে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এসব বৈঠকে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের রোডম্যাপ তৈরির কাজ চলছে। এ ছাড়া ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্তও আসছে এসব বৈঠক থেকে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টিও দলের ভেতরে-বাইরে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

তারেক নেতৃত্ব নেওয়ার পর স্থানীয় পর্যায়ের কোনো নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়ে দলের মধ্যে অসন্তোষের ঘটনা ঘটেনি। কারণ, তৃণমূল পর্যায়ের মতামতের ভিত্তিতে ওই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্র সেখানে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। এর আগে এসব নির্বাচনে প্রার্থিতার জন্য উপজেলা, জেলা এমনকি কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদের লবিং ও তদবিরে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক অসন্তোষ ছিল। তারেক রহমান সরাসরি তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে তাঁদের মনোভাব জানার চেষ্টা করছেন। সূত্র জানায়, চলমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তও তারেকের নেতৃত্বে স্থায়ী কমিটি নিয়েছে।

জানা গেছে, বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য করার সিদ্ধান্ত বিএনপি নীতিগতভাবে নিয়েছে। ঐক্যের ফর্মুলা বা প্রক্রিয়া কী হবে তা নিয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা শুরু হয়েছে। জানা গেছে, প্রধান শরিক জামায়াতকে জোটে না রাখার ব্যাপারেও সম্মত হয়েছেন তারেক। এতে দলের বেশির ভাগ সিনিয়র নেতা খুশি হয়েছেন।

আছে বিরূপ আলোচনাও

এদিকে, দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম বছরে তারেক রহমানের নেতৃত্বকে অনিবার্য বলে মনে করা হলেও আস্তে আস্তে দলের মধ্যে তাঁকে নিয়ে বিরূপ আলোচনা ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। জানা যায়, এটা প্রথম শুরু হয় যখন তিনি দলে তাঁর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। দলের বিভিন্ন জায়গায় সুযোগ পেলেই তিনি নিজের পছন্দের লোককে বসাতে থাকেন। এ ঘটনায় খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিতদের অনেকে অখুশি হন। কেউ কেউ বিষয়টি খালেদা জিয়ার নজরে আনেন।

সাম্প্রতিককালে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ ও শওকত মাহমুদকে শোকজের সিদ্ধান্ত তারেক এককভাবে নেন বলে জানা যায়। ফলে স্থায়ী কমিটির প্রায় সব নেতা ওই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন। আড়ালে তাঁরা এ ঘটনার সমালোচনা করেন। দলের উদার ও মুক্তিযোদ্ধা নেতারাও বিষয়টি ভালোভাবে নেননি। তাঁদের দু-একজন বিষয়টি খালেদা জিয়ার কাছে নিয়ে গেলে তিনি তারেককে ধীরে চলো নীতি গ্রহণের নির্দেশ দেন বলে জানা যায়। পাশাপাশি নেতাদেরও তিনি ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। সম্প্রতি স্থায়ী কমিটিতে আলোচিত দু-একটি ঘটনা নিয়ে বিএনপিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার খবর পাওয়া গেছে। সূত্র জানায়, সর্বশেষ বৈঠকে দলের একজন নেতা নির্বাচনী আসনভিত্তিক একজন নেতা বা জোনাল কমান্ডার ঠিক করার প্রস্তাব দেন। ওই নেতা বলেন, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, আন্দোলন তথা নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্ভাব্য ওই প্রার্থীকে কেন্দ্র করে হলেই ভালো ফল পাওয়া যাবে। সূত্র মতে, এ ধরনের প্রস্তাব উপস্থিত প্রায় সব নেতা সমর্থন করেন। তবে একজন নেতা যোগ করেন, জোনাল এই কমান্ডার বা নেতাদের সমন্বয় করার জন্য ঢাকায় একজনকে দায়িত্ব দিলে বিষয়টি আরো ভালো হয়। এর জবাবে তারেক প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘কেন? আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্যারিসে থাকাবস্থায়ই ইরানে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। বিশ্বের আরো অনেক জায়গায় বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব সংশ্লিষ্ট নেতা বাইরে থেকেই দিয়েছেন। তাহলে এখানে নেতা লাগবে কেন?’ জানা যায়, নেতারা এই কথায় ক্ষুব্ধ হলেও তাঁরা ধরে নিয়েছেন যে তারেক কখনোই নেতৃত্ব অন্যদের হাতে ছাড়তে রাজি নন।

এদিকে, দল গোছানোর দায়িত্ব তারেক একা কাঁধে তুলে নেওয়ায় দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষও চলছে। ওই প্রক্রিয়ার সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের যুক্ত না করায় এবং তাঁদের প্রত্যেকের নির্বাচনী এলাকায় কমিটি গঠন নিয়ে সমস্যা তৈরি হওয়ায় নেতাকর্মীদের চাপের মুখে পড়েছেন তাঁরা। ফলে অনেক জায়গায় কমিটি গঠন করেও স্থানীয় বিরোধের কারণে সেগুলো আবার বাতিল করতে হচ্ছে।

এদিকে কমিটি গঠন নিয়ে অঙ্গসংগঠনগুলোর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে মূল বিএনপির। কারণ তারেকের নির্দেশে ছাত্রদল, যুবদলসহ অঙ্গসংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কমিটি গঠন করছেন বিএনপিকে পাশ কাটিয়ে। এতে জেলা, উপজেলাসহ সারা দেশে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই বলছেন, চেষ্টা করেও তারেক রহমান এ ক্ষেত্রে সফল হতে পারছেন না।

এ ছাড়া সঠিক রাজনৈতিক কর্মকৌশল ঠিক না করলে শুধু সংগঠন দিয়ে কিছু হবে না বলে অনেকে মনে করছেন। তাঁদের মতে, গত দুটি নির্বাচনে সংগঠনের কারণে নয়, সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবেই বিএনপি ক্ষমতার বাইরে আছে।

এর আগে ২০১৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন, জামায়াতকে ধানের শীষ মার্কায় নির্বাচন করার সুযোগদান এবং দলের নির্বাচিত এমপিদের সংসদে যোগদানের ঘটনায়ও এককভাবে তারেকের সিদ্ধান্তে হয়েছে বলে জানা যায়। ওই ঘটনায়ও দলের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে।

অবশ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলের জন্য তারেক রহমানের যেটা করা দরকার সেটি করছেন। এখন সেটি ভালো কী মন্দ তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে এখন তিনি যা করছেন সেটিকে ইতিবাচকভাবে দেখাই দলের জন্য ভালো।’
সৌজন্যে : কালের কন্ঠ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here