শনিবার, ১৭ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং
শিরোনাম
  • **কাসেম সোলেমানির ঘনিষ্ঠ স্থানীয় কমান্ডার আব্দেলহোসেইন মোজাদ্দামিকে বুধবার তার বাসার সামনে গুলি করে হত্যা করেছে দুই মুখোশধারী**রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় মিয়ানমারকে জরুরি ভিত্তিতে চার দফা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে)** রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সংবিধান আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব প্রাথমিকভাবে সমর্থন করেছে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট দুমা** রুট 19 এর নাম বদলে গভর্নর ফিল মারফি মঙ্গলবার বিল প্যাসক্রেলের নামে সড়ক নামকরণের একটি বিলে স্বাক্ষর করেছেন** প্যাটারসনে মেইন স্ট্রিটে পীষ্ঠ হয়ে ৬১ বছর বয়সী ব্যক্তির মৃত্যু** ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের বিরুদ্ধে হলফনামায় সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে ব্যবস্থা চেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক**
শনিবার, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯ ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ
A- A A+ Print

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ ; বিনম্র শ্রদ্ধায় সূর্যসন্তানদের স্মরণ জাতির

১৪ ডিসেম্বর। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারানোর দিন। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিন।পৃথিবীর ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাঙালি বুদ্ধিজীবী নিধন বাংলাদেশের ইতিহাসে নৃশংসতম ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ।

‘আজ এই ঘোর রক্ত গোধূলীতে দাঁড়িয়ে/ আমি অভিশাপ দিচ্ছি তাদের/ যারা আমার কলিজায় সেঁটে দিয়েছে/ একখানা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ’—দেশের প্রধান কবি প্রয়াত শামসুর রাহমান তার কবিতায় এভাবেই জাতির সূর্যসন্তানদের হত্যাকারী এবং তাদের মদদদাতাদের শাস্তি কামনা করেছেন। শুধু প্রয়াত এ শ্রেষ্ঠ কবিই নন, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া দেশের সকল প্রান্তে একাত্তরের রণধ্বনির মতোই একই আওয়াজ উঠেছে- ‘আর দেরি নয়, বুদ্ধিজীবী হন্তারক অন্য যুদ্ধাপরাধীদেরও ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড চাই’।

দেশের প্রধান কবিসহ জনতার দাবি আজ পূরণের পথে। তাই শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে এবার যোগ হয়েছে ভিন্নমাত্রা। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর মানবতাবিরোধী অপরাধীরা আজ সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি। ইতোমধ্যে যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। অন্য শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদেরও কয়েকজন কারাগারে ফাঁসির সেলে মৃত্যুর প্রহর গুণছেন। কেউবা দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন। তবে ফেরারি এসব অপরাধীদের ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকরের মাধ্যমে জাতিকে কলঙ্ক মোচনের প্রক্রিয়াও চালাচ্ছে সরকার।

মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময়েই কাপুরুষ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ দেশিয় দোসর নরঘাতক রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের দিয়ে বুদ্ধিজীবীদের ওপর চালায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। বিশেষ করে ডিসেম্বরে তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার নীলনকশা তৈরি করে। এর অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের শেষ সপ্তাহে জাতি যখন বিজয়ের খুব কাছে সেই সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বরেণ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকদের রাতের আঁধারে চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। ১০ ডিসেম্বর থেকে শুরু ১৫ ডিসেম্বর রাতের বিজয়ের উষালগ্ন পর্যন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ের বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ চালায় কিলিং স্কোয়ার্ড আলবদর বাহিনী। ডিসেম্বর ১২, ১৯৭১। আর্মি সদর দফতর। প্রাদেশিক সরকারের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী বসে আছেন। তার ডাকে উপস্থিত হয়েছেন আলবদর ও আলশামসের কেন্দ্রীয় অধিনায়করা। তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় গোপন শলা-পরামর্শ। এই বৈঠকে চূড়ান্ত তালিকা তুলে দেওয়া হয়। প্রণয়ন করা হয় বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল পরিকল্পনা। এই হত্যাকাণ্ড যে সংঘটিত হবে অনেক আগে থেকেই তার নীলনকশা চলছিল। পরাজয় নিশ্চিত জেনে এদিনই চূড়ান্ত আঘাত হানার পরিকল্পনা করে পাকবাহিনী। তাদের অস্ত্র নিয়ে সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠে নামে আলবদর, আলশামস বাহিনী।বিশেষ করে ১৪ ডিসেম্বর নির্মম নির্যাতন-নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে শহীদ হন বুদ্ধিজীবীরা।

জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবী হত্যা স্মরণে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা অর্জনের পরের বছর ১৯৭২ সাল থেকেই সশ্রদ্ধ চিত্তে ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করে আসছে।

স্বাধীনতাবিরোধী চক্র বুঝতে পেরেছিল, পরাজয় তাদের অনিবার্য। জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীরা বেঁচে থাকলে এ মাটিতে ওরা বসবাস করতে পারবে না। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশ আবার ফুলে-ফলে ভরে উঠবে। তাই পরিকল্পিতভাবে জাতিকে মেধাহীন ও পঙ্গু করতে দেশের বরেণ্য সব ব্যক্তিদের রাতের অন্ধকারে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হয়। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম বর্বর ঘটনা যা বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষকে স্তম্ভিত করেছিল। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পর ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে বুদ্ধিজীবীদের মরদেহ ফেলে রেখে যায়।

বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা আজ পর্যন্ত গণনা করা হয়নি। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ’ শীর্ষক গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, এদের মধ্যে ৯৯১ জন ছিলেন শিক্ষাবিদ, ৪৯ জন চিকিত্সক, ৪২ জন আইনজীবী এবং ১৬ জন সাহিত্যিক, শিল্পী ও প্রকৌশলী। বুদ্ধিজীবী নিধনের এ তালিকায় ঢাকা বিভাগে ২০২ জন শিক্ষক ও ১০ জন আইনজীবীকে হত্যা করা হয় । চট্টগ্রাম বিভাগে ২২৪ জন শিক্ষক ও ১০ জন আইনজীবীকে হত্যা করা হয়। খুলনা বিভাগে ২৮০ জন শিক্ষক ও ছয়জন আইনজীবীকে হত্যা করা হয়। রাজশাহী বিভাগে ২৬২ জন শিক্ষক ও ১৫ জন আইনজীবীকে হত্যা করা হয়। তবে এ তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নাম ছিল না।

যাদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন এ এন এম মুনীর চৌধুরী, ড. জিসি দেব, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, আবদুল মুকতাদির, এস এম রাশীদুল হাসান, ড. এন এম ফয়জুল মাহী, ফজলুর রহমান খান, এ এন এম মুনীরুজ্জামান, ড. সিরাজুল হক খান, ড. শাহাদাত আলী, ড. এম এ খায়ের, এ আর খান খাদিম, মো. সাদেক, শরাফত আলী, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন অধ্যাপক মীর আবদুল কাইয়ুম, হবিবর রহমান, সুখরঞ্জন সমাদ্দার, ড. আবুল কালাম আজাদ। সাংবাদিক ছিলেন সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, খোন্দকার আবু তালেব, নিজামুদ্দীন আহমদ, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, শেখ আবদুল মান্নান (লাডু), সৈয়দ নজমুল হক, এম আখতার, আবুল বাসার, চিশতী হেলালুর রহমান, শিবসদন চক্রবর্তী, সেলিনা পারভীন। এছাড়া শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, সাহিত্যিক পূর্ণেন্দু দস্তিদার, মেহেরুন্নেসা, দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহাসহ আরো অসংখ্য নাম।

যথাযোগ্য মর্যাদায় শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস-২০১৯ পালনের লক্ষ্যে জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ৭টা ৫ মিনিটে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। পুষ্পস্তবক অর্পণ অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ অন্যান্য বেসরকারি টিভি চ্যানেল সরাসরি সম্প্রচার করবে।

বছর ঘুরে আবারও এসেছে ১৪ ডিসেম্বর—শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাতি আজ স্মরণ করবে একাত্তরে অকালে প্রাণ হারানো জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের।

দিবসটির কর্মসূচি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে শহিদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ ও মুক্তিযোদ্ধারা সকাল ৭টা ২২ মিনিটে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে এবং সকাল সাড়ে আটটায় রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। সকাল সাড়ে আটটায় সর্বস্তরের জনগণ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।

Comments

Comments!

 Natunsokal.com

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ ; বিনম্র শ্রদ্ধায় সূর্যসন্তানদের স্মরণ জাতির

শনিবার, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯ ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ

১৪ ডিসেম্বর। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারানোর দিন। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিন।পৃথিবীর ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাঙালি বুদ্ধিজীবী নিধন বাংলাদেশের ইতিহাসে নৃশংসতম ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ।

‘আজ এই ঘোর রক্ত গোধূলীতে দাঁড়িয়ে/ আমি অভিশাপ দিচ্ছি তাদের/ যারা আমার কলিজায় সেঁটে দিয়েছে/ একখানা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ’—দেশের প্রধান কবি প্রয়াত শামসুর রাহমান তার কবিতায় এভাবেই জাতির সূর্যসন্তানদের হত্যাকারী এবং তাদের মদদদাতাদের শাস্তি কামনা করেছেন। শুধু প্রয়াত এ শ্রেষ্ঠ কবিই নন, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া দেশের সকল প্রান্তে একাত্তরের রণধ্বনির মতোই একই আওয়াজ উঠেছে- ‘আর দেরি নয়, বুদ্ধিজীবী হন্তারক অন্য যুদ্ধাপরাধীদেরও ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড চাই’।

দেশের প্রধান কবিসহ জনতার দাবি আজ পূরণের পথে। তাই শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে এবার যোগ হয়েছে ভিন্নমাত্রা। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর মানবতাবিরোধী অপরাধীরা আজ সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি। ইতোমধ্যে যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। অন্য শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদেরও কয়েকজন কারাগারে ফাঁসির সেলে মৃত্যুর প্রহর গুণছেন। কেউবা দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন। তবে ফেরারি এসব অপরাধীদের ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকরের মাধ্যমে জাতিকে কলঙ্ক মোচনের প্রক্রিয়াও চালাচ্ছে সরকার।

মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময়েই কাপুরুষ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ দেশিয় দোসর নরঘাতক রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের দিয়ে বুদ্ধিজীবীদের ওপর চালায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। বিশেষ করে ডিসেম্বরে তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার নীলনকশা তৈরি করে। এর অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের শেষ সপ্তাহে জাতি যখন বিজয়ের খুব কাছে সেই সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বরেণ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকদের রাতের আঁধারে চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। ১০ ডিসেম্বর থেকে শুরু ১৫ ডিসেম্বর রাতের বিজয়ের উষালগ্ন পর্যন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ের বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ চালায় কিলিং স্কোয়ার্ড আলবদর বাহিনী। ডিসেম্বর ১২, ১৯৭১। আর্মি সদর দফতর। প্রাদেশিক সরকারের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী বসে আছেন। তার ডাকে উপস্থিত হয়েছেন আলবদর ও আলশামসের কেন্দ্রীয় অধিনায়করা। তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় গোপন শলা-পরামর্শ। এই বৈঠকে চূড়ান্ত তালিকা তুলে দেওয়া হয়। প্রণয়ন করা হয় বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল পরিকল্পনা। এই হত্যাকাণ্ড যে সংঘটিত হবে অনেক আগে থেকেই তার নীলনকশা চলছিল। পরাজয় নিশ্চিত জেনে এদিনই চূড়ান্ত আঘাত হানার পরিকল্পনা করে পাকবাহিনী। তাদের অস্ত্র নিয়ে সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠে নামে আলবদর, আলশামস বাহিনী।বিশেষ করে ১৪ ডিসেম্বর নির্মম নির্যাতন-নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে শহীদ হন বুদ্ধিজীবীরা।

জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবী হত্যা স্মরণে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা অর্জনের পরের বছর ১৯৭২ সাল থেকেই সশ্রদ্ধ চিত্তে ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করে আসছে।

স্বাধীনতাবিরোধী চক্র বুঝতে পেরেছিল, পরাজয় তাদের অনিবার্য। জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীরা বেঁচে থাকলে এ মাটিতে ওরা বসবাস করতে পারবে না। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশ আবার ফুলে-ফলে ভরে উঠবে। তাই পরিকল্পিতভাবে জাতিকে মেধাহীন ও পঙ্গু করতে দেশের বরেণ্য সব ব্যক্তিদের রাতের অন্ধকারে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হয়। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম বর্বর ঘটনা যা বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষকে স্তম্ভিত করেছিল। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পর ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে বুদ্ধিজীবীদের মরদেহ ফেলে রেখে যায়।

বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা আজ পর্যন্ত গণনা করা হয়নি। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ’ শীর্ষক গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, এদের মধ্যে ৯৯১ জন ছিলেন শিক্ষাবিদ, ৪৯ জন চিকিত্সক, ৪২ জন আইনজীবী এবং ১৬ জন সাহিত্যিক, শিল্পী ও প্রকৌশলী। বুদ্ধিজীবী নিধনের এ তালিকায় ঢাকা বিভাগে ২০২ জন শিক্ষক ও ১০ জন আইনজীবীকে হত্যা করা হয় । চট্টগ্রাম বিভাগে ২২৪ জন শিক্ষক ও ১০ জন আইনজীবীকে হত্যা করা হয়। খুলনা বিভাগে ২৮০ জন শিক্ষক ও ছয়জন আইনজীবীকে হত্যা করা হয়। রাজশাহী বিভাগে ২৬২ জন শিক্ষক ও ১৫ জন আইনজীবীকে হত্যা করা হয়। তবে এ তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নাম ছিল না।

যাদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন এ এন এম মুনীর চৌধুরী, ড. জিসি দেব, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, আবদুল মুকতাদির, এস এম রাশীদুল হাসান, ড. এন এম ফয়জুল মাহী, ফজলুর রহমান খান, এ এন এম মুনীরুজ্জামান, ড. সিরাজুল হক খান, ড. শাহাদাত আলী, ড. এম এ খায়ের, এ আর খান খাদিম, মো. সাদেক, শরাফত আলী, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন অধ্যাপক মীর আবদুল কাইয়ুম, হবিবর রহমান, সুখরঞ্জন সমাদ্দার, ড. আবুল কালাম আজাদ। সাংবাদিক ছিলেন সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, খোন্দকার আবু তালেব, নিজামুদ্দীন আহমদ, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, শেখ আবদুল মান্নান (লাডু), সৈয়দ নজমুল হক, এম আখতার, আবুল বাসার, চিশতী হেলালুর রহমান, শিবসদন চক্রবর্তী, সেলিনা পারভীন। এছাড়া শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, সাহিত্যিক পূর্ণেন্দু দস্তিদার, মেহেরুন্নেসা, দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহাসহ আরো অসংখ্য নাম।

যথাযোগ্য মর্যাদায় শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস-২০১৯ পালনের লক্ষ্যে জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ৭টা ৫ মিনিটে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। পুষ্পস্তবক অর্পণ অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ অন্যান্য বেসরকারি টিভি চ্যানেল সরাসরি সম্প্রচার করবে।

বছর ঘুরে আবারও এসেছে ১৪ ডিসেম্বর—শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাতি আজ স্মরণ করবে একাত্তরে অকালে প্রাণ হারানো জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের।

দিবসটির কর্মসূচি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে শহিদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ ও মুক্তিযোদ্ধারা সকাল ৭টা ২২ মিনিটে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে এবং সকাল সাড়ে আটটায় রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। সকাল সাড়ে আটটায় সর্বস্তরের জনগণ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।

Please follow and like us:
error0

Comments

comments

X
error