বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে জাতীয় সংসদে। সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে মানসিক সমস্যায় ভোগা অধিকাংশ মানুষই চিকিৎসার আওতায় আসছেন না। একই সঙ্গে জনসংখ্যার তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষ জনবলের সংখ্যাও অত্যন্ত কম।
সোমবার (১৩ জুলাই) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বিশ্বব্যাপী মানসিক রোগের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যা মানুষের দীর্ঘমেয়াদি কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও মৃত্যুর শীর্ষ কারণ হিসেবে এখনও হৃদরোগ ও ক্যান্সার রয়েছে, তবুও দৈনন্দিন জীবন ও উৎপাদনশীলতার ওপর মানসিক রোগের প্রভাব এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯ অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। তবে দুঃখজনকভাবে আক্রান্তদের ৯২ শতাংশেরও বেশি ব্যক্তি কোনো ধরনের চিকিৎসা বা পরামর্শসেবা গ্রহণ করতে পারেন না।
তিনি আরও জানান, দেশের প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা মাত্র ১ দশমিক ১৭ জন। অন্যদিকে সরকারি খাতে নিবন্ধিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন প্রায় ৩৫০ জন, যা দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
এই সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বলে সংসদকে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজধানীর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং পাবনা মানসিক হাসপাতালের মাধ্যমে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। পাশাপাশি ‘মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮’ কার্যকর রয়েছে এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনা (২০২০-২০৩০) বাস্তবায়নের কাজ চলমান। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে মানসিক স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক পরিচালক পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মেন্টাল হেলথ গ্যাপ অ্যাকশন প্রোগ্রাম (MHGAP)-এর আওতায় চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ, নোয়াখালী, বান্দরবান, সিলেট, শেরপুর, নেত্রকোনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কুড়িগ্রাম জেলায় এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
আত্মহত্যা প্রতিরোধেও বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে যশোর, ঝিনাইদহ, সিলেট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্পেশাল ইনিশিয়েটিভ ফর মেন্টাল হেলথ (SIMH) কর্মসূচির জন্য নির্বাচিত বিশ্বের নয়টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় জোরদার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে টেলিমেডিসিন ব্যবস্থার সম্প্রসারণেও কাজ করছে সরকার।
