
ইউরোপের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পর্তুগাল ও স্পেন আজ রাতে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো পর্বে মুখোমুখি হচ্ছে। আইবেরিয়ান উপদ্বীপের এই দুই ফুটবল শক্তির লড়াই শুধু নকআউট পর্বের একটি ম্যাচ নয়, বরং এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত দ্বৈরথগুলোর একটি। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, পরিসংখ্যান এবং দলীয় ভারসাম্য বিশ্লেষণ করে অপটা সুপার কম্পিউটার স্পেনকে এগিয়ে রাখলেও, নকআউট মঞ্চে পর্তুগালকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
অপটার ২৫ হাজার প্রাক-ম্যাচ সিমুলেশন অনুযায়ী, নির্ধারিত ৯০ মিনিটে স্পেনের জয়ের সম্ভাবনা ৪৮.৬ শতাংশ। অন্যদিকে পর্তুগালের জয়ের সম্ভাবনা ২৫.৬ শতাংশ এবং ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর সম্ভাবনা ধরা হয়েছে ২৫.৮ শতাংশ।
শেষ ষোলোতে ওঠার ক্ষেত্রে দুই দলের যাত্রাপথ ছিল একেবারেই ভিন্ন। কোচ রবার্তো মার্টিনেজের অধীনে পর্তুগালকে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। অতিরিক্ত সময়ে গঞ্জালো রামোসের গুরুত্বপূর্ণ গোল, বিতর্কিত একটি ভিএআর সিদ্ধান্ত এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ নকআউট পর্বে প্রথম গোলের সুবাদে নাটকীয় জয় পেয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে পর্তুগিজরা।
এই জয়ের পর টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠাই এখন পর্তুগালের প্রধান লক্ষ্য। এর আগে ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে পরপর দুটি নকআউট ম্যাচ জিতেছিল তারা। তবে এরপর আর সেই ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি দলটি।
অন্যদিকে এবারের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে স্পেন। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল এখন পর্যন্ত চারটি ম্যাচ খেলেও একবারও গোল হজম করেনি। শেষ ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে তারা শেষ ষোলো নিশ্চিত করে। ওই ম্যাচে মিকেল ওইয়ারসাবাল জোড়া গোল করেন, আর একটি গোল আসে পেদ্রো পোরোর কাছ থেকে।
স্পেনের রক্ষণভাগের এই অসাধারণ দৃঢ়তা তাদের সামনে নতুন একটি বিশ্বকাপ রেকর্ড গড়ার সুযোগ এনে দিয়েছে। ২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর বিপক্ষে গোলশূন্য ম্যাচটিও বিবেচনায় নিলে, পর্তুগালের বিপক্ষেও যদি তারা ক্লিন শিট ধরে রাখতে পারে, তবে বিশ্বকাপ ইতিহাসে টানা ছয়টি ম্যাচে কোনো গোল না খাওয়া প্রথম দল হিসেবে নিজেদের নাম লেখাবে।
শুধু রক্ষণেই নয়, সামগ্রিক পারফরম্যান্সেও অসাধারণ ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে স্পেন। বর্তমানে তারা টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত। এই ম্যাচেও হার এড়াতে পারলে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে গড়া নিজেদের সর্বোচ্চ ৩৫ ম্যাচের অপরাজিত থাকার রেকর্ড স্পর্শ করবে। ইউরোপের দলগুলোর মধ্যে ইতালি ছাড়া আর কোনো দল এর চেয়ে দীর্ঘ সময় অপরাজিত থাকার কীর্তি গড়তে পারেনি।
কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেও ব্যক্তিগতভাবে একটি বড় রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তার অধীনে বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে স্পেন প্রথম ১১টি ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে। পর্তুগালকে হারাতে পারলে আইমে জাকে ও লুই ফন গালের পর তিনি তৃতীয় কোচ হিসেবে বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে প্রথম ১২ ম্যাচে অপরাজিত থাকার কৃতিত্ব অর্জন করবেন।
পর্তুগালের সবচেয়ে বড় ভরসা অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। স্পেনের বিপক্ষে তার চারটি গোল রয়েছে, যা এই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যেকোনো ফুটবলারের যৌথ সর্বোচ্চ। ২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে তার হ্যাটট্রিক আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। অন্যদিকে স্পেনের আক্রমণভাগে মিকেল ওইয়ারসাবাল দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন। এবারের বিশ্বকাপে চার গোল করে তিনি ২০১০ সালে ডেভিড ভিয়ার পাঁচ গোলের পর এক আসরে স্পেনের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন।
দুই দলের অতীত পরিসংখ্যানও ম্যাচটিকে বাড়তি উত্তেজনা এনে দিয়েছে। বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে স্পেন ও পর্তুগাল। এর মধ্যে দুই দলই একটি করে ম্যাচ জিতেছে এবং বাকি তিনটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। সর্বশেষ বিশ্বকাপে ২০১৮ সালে তাদের লড়াই ৩-৩ গোলে শেষ হয়েছিল, যেখানে হ্যাটট্রিক করেছিলেন রোনালদো। আর ইউরো ২০১২-এর সেমিফাইনালে গোলশূন্য ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে জিতে ফাইনালে উঠেছিল স্পেন।
তবে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের সামগ্রিক রেকর্ড স্পেনের পক্ষেই কথা বলছে। শেষ ১২টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে পর্তুগাল মাত্র একবার স্পেনকে হারাতে পেরেছে, সেটিও ২০০৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে। যদিও সর্বশেষ দেখা হওয়া ২০২৫ সালের নেশনস লিগের ফাইনালে টাইব্রেকারে জয় তুলে নিয়ে শিরোপা জিতেছিল পর্তুগাল, যা এই ম্যাচের আগে তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে পরিসংখ্যান, সাম্প্রতিক ফর্ম এবং ধারাবাহিকতায় স্পেন এগিয়ে থাকলেও নকআউট ফুটবলে একটি মুহূর্তই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তাই ডালাসে অনুষ্ঠিত এই আইবেরিয়ান ডার্বিতে শেষ পর্যন্ত কে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করবে, তার উত্তর মিলবে মাঠের লড়াই শেষ হওয়ার পরই।